Tahmina / জুন 19, 2020

শিশুর শারীরিক সুস্থতা নিশ্চিত করতে করতে তাদের মানসিক দিকটা কি অবহেলা করছি না ?

শেয়ার করুন আপনার বন্ধুদের সাথে

আরে ভাবী কি যে করবো, “আমার বাচ্চা খেতেই চায় না”, “বাচ্চাটা ইদানীং এতো চিল্লাচিল্লি করে, একদম কথা শোনে না” এমন হাজার হাজার অভিযোগ থাকে একজন মায়ের। এতো এতো অভিযোগের ভিড়ে আড়ালে থেকে যায় বাচ্চাদের ও শরীরের মাঝে যে একটা ছোট মন আছে, সেই মনের অসুখ আছে সেই মনের ভালো লাগা মন্দ লাগা আছে।

প্রমথ চৌধুরী তার বই পড়া উপন্যাসে বলেছিলেন, “আমাদের সমাজে এমন অনেক মা আছেন যারা সন্তানকে ক্রমান্বয়ে গরুর দুধ গেলানোটাই শিশুর স্বাস্থ্যরক্ষার ও বলবৃদ্ধির সর্বপ্রধান উপায় মনে করেন, দুগ্ধ অবশ্য অতিশয় উপাদেয় পদার্থ, কিন্তু তার উপকারিতা যে ভোক্তার জীর্ণ করার শক্তির অপর নির্ভর করে এ জ্ঞান ওই শ্রেণীর মাতৃকুলের নেই, তাদের বিশ্বাস ও বস্তু পেটে গেলেই উপকার হবে, কাজেই শিশু যদি তা গিলতে আপত্তি করে তাহলে সে যে বেয়াড়া ছেলে, সে বিষয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ থাকে না । অতএব তখন তাকে ধরে বেধে জবরদস্তি করে দুধ খাওয়ানোর ব্যবস্থা করা হয় , শেষটায় সে যখন এই দুগ্ধ পান ক্রিয়া হতে অব্যাহতি লাভ করার জন্য মাথা নাড়তে, হাত পা ছুড়তে শুরু করে, তখন স্নেহময়ী মাতা বলেন, আমার মাথা খাও মরা মুখ দেখ, এই এক ঢোক আর এক ঢোক ইত্যাদি। মাতার উদ্দেশ্য যে সাধু সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই কিন্তু এই বিষয়ে ও কোন সন্দেহ নেই যে উক্ত বলা কওয়ার ফলে মা শুধু ছেলের যকৃতের মাথা খান এবং ঢোকের পর ঢোক তার মরা মুখ দেখার সম্ভাবনা বাড়িয়ে চলেন।”

কখনো কি ভেবে দেখেছেন শিশুর সামনে আপনার অজান্তে বলে ফেলা একটা কঠিন কথা অথবা অপ্রকাশ্য কথা একটা শিশুর মনোজগতে কি প্রভাব ফেলতে পারে? আপনার শিশু সন্তানটির হঠাৎ পরিবর্তন হয়ে যাওয়ার পেছনে মানসিক কোন সমস্যা আছে কিনা!

শিশুর বেড়ে ওঠার সময়টা হয়তো আমাদের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর ও আনন্দের মুহূর্ত । এই সময় আমরা তাদের শারীরিক দিকটা যত-বেশি গুরুত্ব দেই মানসিক দিকটা ঠিক ততটাই অবহেলা করি, আমরা অকপটে বলে যাই এই পরিবর্তন তো স্বাভাবিক সব বাচ্চার এমন হয়। একটা শিশুর সামনে কোন কথাটি বলা উচিত কোনটা না এসব না ভেবেই অনেক অসঙ্গতিপূর্ণ কথাবার্তা আচরণ আমরা শিশুদের সামনে বলে থাকি। একটা বাড়ন্ত শিশুর মনে কথাটি কি প্রভাব ফেলবে সে কথাটি আমরা কখনই চিন্তা করি না।

শিশু যত বড় হতে থাকে তার শারীরিক দিকের পাশাপাশি মানসিক দিকের প্রতি ও পিতা মাতা বা অভিভাবকের সমান যত্নশীল হওয়া উচিত।

একজন মানুষের শারীরিক ক্ষতি হয়তো পুষিয়ে নেওয়া যেতে পারে কারণ ক্ষতিটি দৃশ্যমান কিন্তু তার মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করতে না পারলে আপনার সন্তান যে মানসিক বিকারগ্রস্ত হবে না তার কোন নিশ্চয়তা কি আছে!

সন্তানকে পর্যাপ্ত সময় দিন, তার সামনে এমন কোন আচরণ করবেন না যা তার কোমল মনের মাঝে কঠিন প্রশ্নের জন্ম দেয়। বাড়ন্ত শিশুর সাথে কথা বলুন তাদের হাজারো কৌতূহলী প্রশ্নের সহজ করে উত্তর দিন, তাদের চোখে পৃথিবীটা শত শত রহস্যের ভাণ্ডার সেই রহস্য উদঘাটন করতে সাহায্য করুন।

শিশুরা সাধারণত অনুকরণ প্রিয় হয়। তারা যা দেখবে যা শুনবে তাই করতে চাইবে। ধরুন রাস্তায় সে একজন উদ্ভট মানুষ দেখল সে কিন্তু তার অভিনয় করে মজা পাবে বারবার সেটি করবে, এটি শিশুদের স্বাভাবিক বিশিষ্ট । শিশুরা সবচেয়ে বেশি অনুকরণ করে তাদের পিতামাতা ও পরিবারের বাকী সদস্যদের। সতর্ক থাকবেন তাদের সামনে এমন কোন আচরণ বা কথাবার্তা বলবেন না যা তাদের জন্য ক্ষতিকর।

অনেকেই বলতে শুনি “ বাচ্চা কথা শোনে না, বোঝালে বোঝে না, বেয়াদবি করে, বড়দের সম্মান করে না” এমন অনেক অনেক কথা । একবার ভেবে দেখুন আপনি শিশুর সামনে আপনার আশেপাশের মানুষের সাথে বা তার সাথে একই আচরণ করছেন না তো ? যেটা সে শিখছে ? আপনি কিংবা আপনার পরিবার বাচ্চার সামনে যা উপস্থাপন করবে আপনার শিশু ঠিক সেটারই প্রতিফলন ঘটাবে, সে কারণে হয়তো বলা হয় পরিবার হচ্ছে শিশুর প্রাথমিক শিক্ষা কেন্দ্র।

সব সময় শিশুরা একই রকম থাকে না, বয়সের সাথে সাথে যেমন শরীরের বৃদ্ধি ঘটে তেমনি মনেরও পরিবর্তন ঘটে । তাকে বুঝতে শিখুন, শিশুর জীবনের প্রত্যেক স্তরে তাকে নতুন করে চিনতে শিখুন, বাচ্চার সাথে সাথে  নিজেকেও নতুন করে তৈরি করুন। বাচ্চাদের শারীরিক সুরক্ষার সাথে সাথে আমরা মানসিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারলেই আমরা আগামীতে একটি সুস্থ উত্তরসূরি পাবো।

(Visited 136 times, 1 visits today)


শেয়ার করুন আপনার বন্ধুদের সাথে