তাজপাতায় আগুন লাগান আর দেখুন কি হয়

মাহবুবা হক / জুন 22, 2020

তেজপাতায় আগুন লাগিয়ে আর দেখুন কি হয়-এর উপকারিতা জেনে নিন

শেয়ার করুন আপনার বন্ধুদের সাথে

তেজপাতা সবার ঘরেই থাকে। কখনো জ্বালিয়েছেন? মন খারাপ  অথবা খুব খারাপ মুডে আছেন? তাহলে এই কাজ টা করুন। একটা অথবা দুইটি তেজপাতা নিন। আপনার বাড়ির অথবা অফিসের রুমে সেটিকে একটি  ট্রেতে অথবা মাটির পাত্রে রেখে আগুনে পোড়ান এবং ১০ মিনিট এভাবে রেখে দিন। অপেক্ষা করুন  আরও ১০ মিনিট।

তেজপাতা কি কাজ করে?

তেজপাতা এর ধোঁয়া আপনার মন এবং পেশীকে রিলাক্সড করবে এবং আপনি দেখবেন খুব সহজে আপনার হাতে থাকা কাজে মনোনিবেশ করতে পারছেন। নিমিষে মুড ভালো করার গুন আছে এর ধোঁয়াতে। একে এরোমা থেরাপি বলা হয়।

Linalool নামক একধরণের প্রাকৃতিক উপাদান যা সাধারণত বেসিল এবং থাইমে পাওয়া যায়, তেজপাতাতেও একই পরিমানে পাওয়া গেছে। এটি আপনার শরীরের স্ট্রেস হরমোনকে কমিয়ে দেয় উল্লেখযোগ্য ভাবে বিশেষ করে যখন এর ধোঁয়া আপনি নাক দিয়ে টেনে নেন।

সাধারণত তেজপাতায় ঘুমের ঔষধ হিসেবে কাজ করার ক্ষমতা আছে। ব্যাথা দূর করার জন্য, এবং যেকোন ধরনের ঘা এর বিরুদ্ধে এটি খুব ভালো কাজ করে। এই ঔষধি তেজপাতায় ব্যাকটেরিয়া এবং ফাংগাসের বিরুদ্ধে কাজ করার ক্ষমতা আছে। এটি আপানার ব্লাড প্রেসার এবং হার্ট রেট কে কমায়। আপনার চেহেরায় বয়সের ছাপ পড়তে দেয়না এই সুগন্ধি পাতা।

এই পাতা সাধারণত ইন্সমনিয়ে বা যাদের ঘুম হয়না তাদের জন্য উপকারী। তাছাড়া যাদের ডিপ্রেশন আছে তারা ব্যাবহার করতে পারেন। এটি আপানার খারাপ মুডকে বদলে দিতে পারে।

অতিরিক্ত স্ট্রেস আমাদের দেহের জন্য বিপদজনক হতে পারে যদি তা অনেকদিন ধরে চলতে থাকে। তেজপাতা আপনাকে প্রশান্ত করবে এবং মঙ্কে ফুরফুরা করে দিবে আপনার কাজের চাপের দিন গুলোতেও।

বৈজ্ঞানিকদের মতে  তেজ পাতা একধরনের অ্যাণ্টি- ইনফ্যাল্মটারী। মৃগী রোগীদের জন্যও খুবই কার্যকরি এই তেজপাতা। যখন সমস্যা দেখা দেয় তখন তেজপাতা পুড়িয়ে সেই ধোঁয়া রোগীর নাকের সামনে ধরলে ধীরে ধীরে রোগী স্বাভাবিক হয়ে ওঠে।

তাজপাতা আগুন লাগান আর দেখুন কি হয়

 

তেজপাতার গুনাগুনঃ

আমাদের দেশে রান্নায় হরহামেশা ব্যবহৃত এই সুগন্ধি পাতা ‘পারফিউম’ তৈরিতে ব্যবহৃত হওয়ার পাশাপাশি, বিভিন্ন ঔষধি এবং ভেষধ উপাদানযুক্ত ‘বে লিফ এসেনসিয়াল অয়েল’য়েও ব্যবহৃত হয়। মিস্টি জাতীয় খাবার, সুপ, বিরিয়ানি, মাংস, মাছ, স্ট্যূ, সস তৈরিতে ব্যবহার করা হয় এই পাতা। রান্না শেষে তুলে ফেলা দেয়া হয় এই পাতা, শুধুমাত্র এর মিস্টি সুগন্ধ ব্যবহার করি আমরা। অনেকে রান্নায় এর গুড়াও ব্যবহার করেন।

সাধারণত তাজা এবং শুকনো এই দুই অবস্থায় বাজারে পাওয়া যায় তেজপাতা। কিছু দোকানে তেজপাতার গুঁড়াও পেতে পারেন। তেজপাতা ভিটামিনস ও মিনারেলস, ম্যাগনেসিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ ও পটাসিয়ামে ভরপুর।  ১০০ গ্রাম তেজপাতায় ২৩ মিলিগ্রাম সোডিয়াম, ৪৩ মিলিগ্রাম আয়রন, ৩.৭ মিলিগ্রাম জিংক, ২.৮ মিলিগ্রাম, ৭.৬ গ্রাম প্রোটিন, ৭৫ গ্রাম কার্বোহাইড্রেট, ১.১ গ্রাম ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড, ১.২ গ্রাম অমেগা-৬ ফ্যাটি এসিড, ২৬ গ্রাম ফাইবার ও সিলেনিয়াম পাওয়া যায়।

মাইগ্রেনের সমস্যা এবং শরীরের বিভিন্ন ব্যথা কমাতে তেজপাতাঃ

তেজপাতায় একধরনের ঔষুধি গুন আছে যা মাইগ্রেনের সমস্যা থেকে খুব সহজে আরাম প্রদান করে।আমাদের শরীরের বিভিন্ন ধরণের ব্যথা বা ফুলে যাওয়া কমাতে তেজপাতার এসেনসিয়াল অয়েল বেশ উপকারী। হাড়ের যেখানে ব্যাথা কিংবা টান পড়া মাংসপেশিতে তেলটি ভালো ভাবে ম্যাসাজ করুন। মাথাব্যথা বা মাইগ্রেইনের ব্যথা সারাতেও এই তেল ব্যবহার করা যায়।

খুব বেশী মাথা ব্যাথা হলে কয়েকটি তেজপাতা পরিষ্কার পানিতে সিদ্ধ করে নিন কয়েক মিনিট। এরপর ছেঁকে নিয়ে সে পানি হাল্কা গরম থাকতে খেয়ে নিন। ব্যাথা কমে আসবে। এছাড়া এই পাতা বেটে তার পেস্ট কপালে লাগালেও ভালো রেজাল্ট পাবেন।

সর্দিকাশি এবং জ্বর :

তেজপাতার ‘অ্যান্টিমাইক্রোবায়াল’ উপাদান শ্বাসযন্ত্রের বিভিন্ন সমস্যা কামাতে সাহায্য করে। সর্দিকাশি, কফ এবং ফ্লু থেকে মুক্তি পেতে তেজপাতা সিদ্ধ করে  সে পানি খেতে পারেন। কিছু পাতা অল্প পানিতে ফুটিয়ে নিন। ১০ মিনিট চুলার আঁচ বন্ধ করে রেখে দিন। এবার একটা সূতি কাপড় সে পানিতে ভিজিয়ে আপনার বুকে রাখুন। অনেক আরাম পাবেন এভাবে।

জ্বর কমাতেও খুব ভালো কাজ দেয় এই পাতা। বারবার যদি জ্বর হতে থাকে তাহলে ২০০ মিলি পানিতে কিছু তেজপাতা সিদ্ধ করুন যাতে পানি চার ভাগের এক ভাগ হয়ে যায়। এবার ছেঁকে নিয়ে সে পানি পান করুন।

হজমশক্তি বাড়ায়:

শরীরের হজমপ্রক্রিয়াকে দ্রুত করার মাধ্যমে খাবারের পুষ্টি উপাদানগুলো ভালোভাবে পরিপাক করতে সহায়তা করে এই পাতা। পেটফাঁপা, বদহজম, বুক জ্বালাপোড়া ইত্যাদির চিকিৎসায় তেজপাতা ব্যবহৃত হয়ে থাকে। বিষাক্ত কিছু পেটে গেলে বা ফুড পয়জনিং হলে বমি ভাব কমাতে তেজপাতা খুব ভালো কাজ করে। কিছু খাবারে উপস্থিত জটিল প্রোটিনকে ভেঙ্গে দ্রুত হজম করতে সাহায্য করে তেজপাতা।

যাদের কন্সটিপেশনের সমস্যা আছে তারা এ পাতা সিদ্ধ পানি খান। আপনি এক টুকরো আদা, আর কিছু তেজপাতা ফুটিয়ে নিয়ে সে পানিতে এক চামচ মধু মিশিয়ে চা হিসেবে পান করতে পারেন। পেটের সব ধরনের সমস্যার সমাধান দিতে পারে এই চা।

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণঃ

এক গবেষণায় দেখা গেছে যে যারা দিনে দুইবার তেজপাতার গুড়ার পানীয় পান করেন বা চা খান  তাদের রক্তে শর্করার পরিমাণ কমে যায়। ভালো ফল পেতে এইভাবে টানা ৩০ দিন খেয়ে যেতে হবে।  এই পাতাতে আছে উপকারী উপাদান যা কার্যকরী হারে ইনসুলিনকে সাহায্য করতে পারে।এটি  টাইপ টু ডায়াবেটিস ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকির আশঙ্কাও কমায়।

হার্ট এর স্বাস্থ্য ভাল রাখে ঃ

তেজ পাতায় আছে Rutin , Salicylates, Phytonutrients  এবং Caffeic acid নামক কিছু যৌগ যারা আপনার হৃদযন্ত্রের দেওয়ালগুলিকে শক্তিশালী করে তুলতে এবং কোলেস্টেরলের মাত্রা হ্রাস করতে সাহায্য করে।  উচ্চ কোলেস্টেরলের মাত্রা কমিয়ে হৃদরোগ বা স্ট্রোকের ঝুঁকি থেকে আপনাকে বাচাঁতে পারে।

ক্যান্সার কোষের বৃদ্ধি এবং কিডনিতে পাথর হওয়া বন্ধ করে:

কিডনির বিভিন্ন সমস্যা কমাতে তেজপাতা পানিতে সিদ্ধ করে খেলে উপকার মিলবে। যাদের কিডনিতে পাথর হওয়ার আশঙ্কা আছে তাদের জন্যও এটি বেশ উপকারী। তেজপাতায় থাকা Caffeic acid, Quercetin, Euganol এবং Catechins বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সার এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সাহায্য করে।

এক গবেষণায় দেখা যায় যে তেজপাতা আপনার শরীরের urease মাত্রা হ্রাস করতে সহায়তা করে যা কিডনি পাথর এবং অন্যান্য গ্যাস্ট্রিক সমস্যা বাড়িয়ে দেয়। তাই নিয়মিত তেজপাতা সিদ্ধ পানি খেলে এর পরিমান কমে যায়।

মেয়েদের পিরিয়ড সম্পর্কিত এবং সন্তান জন্মদানের পরবর্তি সমস্যা কমায়ঃ

অনিয়মিত মাসিক বা পিরিয়ড এবং অন্যান্য সমস্যায় এটি খুব ভালো কাজ করে যদি তেজপাতার চা পান করা হয়। এছাড়া  এটি সাদা স্রাব এর সমস্যা এবং দুর্গন্ধ কমাতে পারে।

এতে প্রচুর পরিমানে থাকা ফলিক এসিড মেয়েদের Periconception সময়ের জটিলতা কমায়। সন্তান জন্মদানের তিন মাস আগে এবং তিন মাস পরের সময়কে পেরিকন্সেপশান পিরিয়ড বলা হয়। গর্ভের সন্তান কে পর্যাপ্ত ফলিক এসিড সরবরাহ করে এটি সন্তানের যেকোন শারীরিক সমস্যার পরিমান কমায়।

কাপড়ে পোকা ধরা বন্ধ করে ঃ

অতি যত্নে তুলে রাখা  জামা কাপড়ের মধ্যে অনেক সময় পোকা দেখা দেয়। বিশেষ করে পশমের কাপড় বা সিল্কের কাপড় অনেকদিন আলমারিরে পড়ে থাকলে এটি হতে দেখা যায়। জামার মধ্যে যদি শুকনো  তেজপাতা রেখে দেওয়া যায় তাহলে কোন পোকা হয় না।

তেজপাতার সৌন্দর্যবর্ধক গুণাবলীঃ

ত্বকের সজীবতা ধরে রাখতে:

তেজপাতা ত্বকে বলিরেখা সৃষ্টির জন্য দায়ি ‘ফ্রি র্যা ডিকেল’ নিষ্ক্রিয় করে। ঘরে সহজেই ‘অ্যান্টি-এইজিং সলিউশন’ বানাতে চাইলে তেজপাতা ভেজানো ফুটন্ত পানির বাষ্প মুখে লাগানো যেতে পারে। এরজন্য একটি পাত্রে ৫ টি শুকনো তেজপাতা এবং ২ কাপ পানি নিয়ে ঢাকনা দিয়ে ফুটান। কিছুক্ষন পর ঢাকনা তুলে নিন এবং এভাবে আরোও ২ মিনিট সিদ্ধ হতে দিন। এখন একটি বড় পাত্রে এই পানি নিন এবং একটা বড় তোয়ালে দিয়ে মাথা এবং মুখ ঢেকে রেখে এর বাস্প বা ভাপ নিন।

শরীরের দুর্গন্ধ কমাতে:

এক টুকরা পরিষ্কার কাপড়ে গুঁড়া তেজপাতা কুসুম গরম পানিতে কিছুক্ষণ ডুবিয়ে রেখে, এই পানি গোসলের পানিতে মিলিয়ে গোসল করতে পারেন।চন্দন ও তেজপাতা একসাথে বেটে ত্বকে লাগিয়ে ঘণ্টাখানেক রাখুন। তারপর ধুয়ে নিন। ত্বক উজ্জ্বল ও সতেজ দেখাবে। গায়ে দুর্গন্ধ থাকলে  দূর হয়ে যাবে।

ত্বক ও দাঁত উজ্জ্বল করতে:

তেজপাতা সিদ্ধ করুন। ঠাণ্ডা হলে তা দিয়ে মুখ ধুয়ে ফেলুন। ত্বক ফর্সা করার পাশাপাশি এই মিশ্রণ ব্রণ শুকাতেও সাহায্য করে। উজ্জ্বল ঝকঝকে দাঁত পেতে সপ্তাহে কয়েকবার দাঁতে তেজপাতা ঘষা যেতে পারে।

খুশকি এবং চুলপড়া কমাতে:

তেজপাতা সিদ্ধ পানি দিয়ে চুল ধুলে খুশকি কমে। চুল কমে যাওয়ার স্থানগুলোতে তেজপাতার এসেনসিয়াল অয়েল লাগাতে  পারেন যা চুল পড়া কমাতে খুব কার্যকর।

চুলের উকুন তাড়ায় তেজপাতা ঃ

প্রায় ৫০ গ্রাম তেজপাতার গুঁড়ো ৪০০ মিলি পানিতে সিদ্ধ করুন যতক্ষণ না সেটি ১০০ মিলি হয়ে যায়। এবার ছেঁকে নিয়ে এই পানি চুলের গোড়ায় ভালো করে লাগান। এভাবে ৩ থেকে ৪ ঘন্টা রাখুন। এরপর সাধারণ পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। এটি আপনার চুলে উকুনের উৎপাত কমিয়ে দিবে। ভালো ফল পেতে তেজপাতার সাথে bhringraj পাতাও দিয়ে দিন সদ্ধ করার সময়। এটি আপনার চুলকে ঝলমলেও করে তুলবে।

তেজপাতা এবং এর তেল বেশীর ভাগ মানুষের জন্য নিরাপদ মানা হয়। কিন্তু আপনি যদি পুরো একটি পাতা মুখে পুরে গিলে ফেলেন তাহলে তা কখনোই নিরাপদ নয়। এই পাতা পুরোটা হজম হয়না। তাই পরিপাকের পরেও এটি আস্ত থাকে। এর মানে হচ্ছে  যদি এভাবে খাওয়া হয় তাহলে তা আপনার গলা অথবা অন্ত্রে আটকে যেতে পারে।

কেন্দ্রীয় নার্ভাস সিস্টেমকে( CNS) তেজপাতা ধীর গতির করে দিতে পারে। তাই আপনি যদি ঔষধ হিসেবে একে গ্রহন করা শুরু করে থাকেন তাহলে যে কোন সার্জারির কমপক্ষে দুই সপ্তাহ আগে তা বন্ধ রাখুন।

গর্ভাবস্থায় এটি গ্রহন করতে হলে আপনার ডাক্তারের সাথে অবশ্যই কথা বলে নেবেন।

 

(Visited 442 times, 3 visits today)


শেয়ার করুন আপনার বন্ধুদের সাথে