Aokigahara

afrozsadia / মার্চ 23, 2021

আওকিগাহারা : জাপানের রহস্যময় সুইসাইড ফরেস্ট

শেয়ার করুন আপনার বন্ধুদের সাথে

পৃথিবীর সব থেকে পরিশ্রমী আর সুশৃঙ্খল জাতি হিসেবে পরিচিত জাপানিজদের সাথে আত্মহত্যা কথাটি বেমানান হলেও তাদের গোটা একটা বনের নামই সুইসাইড ফরেস্ট যেখানে মানুষ আত্মহত্যা করতে যায়! জাপানের সুইসাইড ফরেস্ট হিসেবে পরিচিত এই বনের প্রকৃত নাম আওকিগাহারা। এখানে প্রতি বছর গড়ে ১০০জনের বেশি মানুষ আত্মহত্যা করে থাকে!! গুমোট অন্ধকার পুরো বন জুড়ে, সূর্যের আলো ঘন গাছ পালা ভেদ করে ভিতরে আসেনা বললেই চলে, চারদিকে অসম্ভব রকমের নিস্তব্ধতা, নেই কোনো প্রানের অস্তিত্ব, তার ওপরে চোখে পড়তে পাড়ে গাছের ডালে ঝুলন্ত লাশ, মাটিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে মরা মানুষের কঙ্কাল!  কোনো হরর মুভির থেকেও হতে পারে ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা যদি কেউ জাপানের এই ভৌতিক রহস্যে ভরা আওকিগাহারা ফরেস্টে পাড়ি জমায়! সাধারণত কোনো মানুষ ভ্রমণের জন্য এই বনে যায় না, যাদের উদ্দেশ্য থাকে আত্মহত্যার তারাই নির্ভিক ভাবে পা বাড়ায় এই বনে। আবার জাপানিজরা অনেকে বিশ্বাস করে এই বনে যে যায় সে আর ফিরে আসেনা! এমনি সব গল্প-কাহিনি আর রহস্যে ভরা জাপানের মাউন্ট ফুজির কাছে অবস্থিত সুইসাইড ফরেস্ট হিসেবে পরিচিত আওকিগাহারা।

ফরেস্ট আওকিগাহারার অবস্থান

জাপানের টোকিও শহর থেকে ১০০ মাইল পশ্চিমে মাউন্ট ফুজির উত্তর-পশ্চিমে ৩৫ বর্গকিলোমিটার অঞ্চল জুড়ে বিস্তৃত জাপানের এই প্রাচীন বন। এটি মাউন্ট ফুজির প্রসিদ্ধ দুই গুহা “বরফ গুহা” এবং “বায়ু গুহা” র নিকটে অবস্থিত। এই বনের কিছু কিছু বৃক্ষের বয়স ৩০০ বছরের বেশি হবে। গভীর সুবিশাল বনটি জুড়ে আছে অদ্ভুত আকৃতির বাকাঁনো গাছ। গাছের শিকড় জালের মতন আকড়ে ধরে আছে পুরো অঞ্চলের মাটি। বনটিতে গাছের ঘনত্ব এতো বেশি যে দিনের বেলাও অন্ধকারে ছেয়ে থাকে চারদিক। আরো রয়েছে শত শত গর্ত আর অন্ধকার গুহা। দূর দূরান্তে নেই কোনো বন্য প্রানীর অস্তিত্ব।



পথ হারানোর সম্ভাবনা!

স্থানীয়দের কাছে আওকিগাহারা জুকাই নামে পরিচিত। জুকাই শব্দের অর্থ  “গাছের সাগর ” বা   The sea of Trees. একে তো অদ্ভুত গাছের ঘনত্বে অন্ধকারে ছেয়ে থাকে পুরো বন তার ওপর আকিওগাহারার মাটিতে ম্যাগনেটিক আয়রনের পরিমান এতো বেশি যে সেলফোন সার্ভিস, জিপিএস সিস্টেম এমনকি কম্পাস ও কাজ করেনা! তাই একবার বনের ভিতরে গেলে পথ হারাবার সম্ভাবনা থাকে ৯৯%!


পরিবেশ সম্মোহন করে আত্মহত্যার জন্য

প্রচলিত লোককথা আছে এই বনের ভিতরে কেউ গেলে সে আত্মহত্যার জন্য সম্মোহিত হয়। আত্মহত্যা প্রবণতার কারণ নিয়ে আছে বিভিন্ন রূপকথা! জাপানি পুরান মতে এ বনে প্রেতাত্মারা ঘুরে বেড়ায় এবং তারা মানুষকে আত্মহত্যার জন্য প্ররোচিত করে।


জাপানি গল্প-উপন্যাসের আত্মহত্যায় প্রভাব

জাপানের বিভিন্ন জনপ্রিয় কমিক, উপন্যাস ও এনাইম সিরিজে আছে আত্মহত্যার গল্প।যেমন ১৯৬০ সালে জাপানি লেখক সেইকো মাটসুমোটোর “টাওয়ার অফ ওয়েবস” উপন্যাসে দুটি চরিত্র আওকিগাহারা জঙ্গলে এসে আত্মহত্যা করেছিলো। এই উপন্যাসের জনপ্রিয়তায় জাপানে আত্মহত্যার পরিমান বেড়ে গেছিলো অনেকাংশে। তাছাড়া ওয়াতাড়ু তুসুরুমির “কমপ্লিট সুইসাইড ম্যানুয়াল ” বইটিতে বলা হয়েছে আওকিগাহারা বন ই আত্মহত্যার উত্তম স্থান। তাই ধরা হয় জাপানি কালচারে তাদের বই-উপন্যাসের অশুভ প্রভাব সুইসাইডকে একটা ট্রেন্ড হিসেবে তুলে ধরেছে।


জাপানে মোট আত্মহত্যার হার

পুরো বিশ্বে আত্মহত্যার পরিসংখ্যানে জাপানের অবস্থান চোখে পড়ার মতন। ২০২০ সালে বিশ্ব যখন কোভিড – ১৯ এর মহামারীতে ব্যতিব্যাস্ত, সেখানে জাপানে কোভিড -১৯ এ মৃতের হারের থেকে আত্মহত্যায় মৃতের হার বেশি বলে জানা যায় বিভিন্ন পরিসংখ্যান থেকে! ২০০৮ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দায় জাপানে আত্মহত্যার হার ছিলো লক্ষনীয়। ২০০৯ সালে জানুয়ারিতে মোট আত্মহত্যার সংখ্যা  দাড়িয়েছিলো ২৫৪৬ জনে যা আগের বছরের তুলনায় ১৫% বেশি। শুধুমাত্র আওকিগাহারা বনেই প্রতি বছর গড় প্রতি ১০০ জন আত্মহত্যা করে! আত্মহত্যার হারের দিক থেকে বিশ্বে সানফ্রান্সিসকোর গোল্ডেন ব্রিজের পরেই এর অবস্থান। ১৯৫০ সাল থেকে ৫শ এর মতো, ১৯৯৮ তে ৭৪জন, ২০০২ সালে ৭৮ জন, ২০০৩সালে ১০০ এর ও বেশি মানুষের আত্মহত্যার জরিপ মিললে এরপর জাপানি সরকার আত্মহত্যার হার প্রকাশ বন্ধ করে দেয়। এছাড়া আওকিগাহারা বন অন্ধকার আর গাছপালায় ঘন গোলকধাঁধাময় হওয়ায় অনেক মৃত দেহ খুঁজে পাওয়াই মুশকিল,গণনা তো দূরের কথা!


আত্মহত্যা অপরাধ নয়

পৃথিবীর প্রায় সব দেশে আত্মহত্যাকে অপরাধ বলে মনে করা হলেও জাপানিজ রা আত্মহত্যা কে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করেনা। জাপানি ইতিহাস আর লোককথা জুড়ে আছে আত্মহত্যা নিয়ে অনেক গল্প, যা জাপানিদের কাছে আত্মহত্যাকে সাহসীকতা হিসেবে বর্ণনা করে। আর এর উল্লেখযোগ্য উদাহরণ জাপানের সামুরাই জাতি। সামুরাই রা শত্রুর কাছে পরাজয় কে ঘৃণার চোখে দেখতো। তাই তারা যুদ্ধে পরাজয় হওয়ার সম্ভবনা দেখলে নিজের পেটে তলোয়ার চালিয়ে আত্মহত্যা করতো। কখনো তারা একটি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই কাজ করতো, একে সেপুক্কা বা হারাকিরি বলা হতো। তারা মনে করতো আত্মহত্যায় মুক্তির মাধ্যমে ইশ্বরের কাছে যাওয়া যায়। আর সেই থেকে এখনো অনেক জাপানিজরা এই নীতিতে বিশ্বাসী।

জাপানে অত্যাধিক হারে আত্মহত্যার কারণ

জাপানে অত্যাধিক হারে আত্মহত্যার কারণ মানসিক চাপ,পারিবারিক সমস্যা, বেকারত্ব, স্কুল বুলিং, হতাশা। যদিও পরিসংখ্যান অনুযায়ী অর্থনৈতিক অবনতি এবং বেকারত্ব জাপানে আত্মহত্যার প্রধান কারণ। জীবন যুদ্ধে হেরে গিয়ে জাপানিরা ইতিহাসের সামুরাই জাতিদের আত্মহত্যা নীতির পথে পা বাড়িয়ে আত্মার মুক্তির পথ খুঁজে। তাই জাপানের কালচারে দেখা যায় আত্মহত্যাকে পজিটিভলি নেওয়ার ইতিহাস এবং সামাজিক ভ্রান্ত বিশ্বাসের জের ধরেই তাদের আত্মহত্যার প্রবণতার হার এতো বেশি।


আত্মহত্যার হার কমাতে জাপানি সরকারের উদ্যোগ

১৯৭০ সালে জাপানি সরকারের উদ্যোগে পুলিশ,সেচ্ছাসেবক ও সাংবাদিকরা সম্মেলিত ভাবে একটি দল গঠন করে যাদের প্রধান কাজ ছিলো মৃতদেহ খুঁজে বের করা এবং লোকজনকে আত্মহত্যার ব্যাপারে নিরুৎসাহিত করা। আত্মহত্যার হার কমানোর জন্য জাপানি সরকার একটি আইন ও পাশ করে। সুইসাইড ফরেস্টের প্রবেশ পথে লাগানো হয় সিকিউরিটি ক্যামেরা, বাড়ানো হয় সতর্ক প্রহরা। কেউ বনের ভিতরে ভ্রমণের জন্য গেলে তাকে রাখা হয় বিশেষ নজরে।


আত্মহত্যা কোনো কিছুর সমাধান নয়

পৃথিবীর প্রায় সব ধর্মে আত্মহত্যা কে মহাপাপ বলে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। তাছাড়া আত্মহত্যা কোনো কিছুর সমাধান নয়।জীবনে চলার পথে উত্থান-পতন আসবেই, কিন্তু কোনো সমস্যা বা কোনো দুঃখই চিরস্থায়ী নয়। আমরা জানিনা হতাশা,দুঃখ,দুর্দশার পর আমাদের জন্য কি অপেক্ষা করছে। তাই আত্মহত্যা কখনোই কোনো সমস্যার সমাধান হতে পারেনা।তাই আমরা আশা করি অতীতের সব খারাপ স্মৃতি মুছে আওকিগাহারা ফরেস্টে পাওয়া যাবেনা আর মৃতের সন্ধান, মানুষ সেখানে যাবে শুধুই মাউন্ট ফুজি এবং আওকিগাহারার অপরুপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য।

(Visited 492 times, 13 visits today)


শেয়ার করুন আপনার বন্ধুদের সাথে