প্রিয় জিনিসটির জন্যে মন খারাপ হয়ে যায়, এতে আমাদের করণীয় কি?

কিছুদিন আগে আমার এক বন্ধুর বাড়িতে এক অনুষ্ঠানে আমি যাই। সেখানে প্রায়ই তিনশ’রও বেশি লোকের নিমন্ত্রণ ছিল। আর যেহেতু বাড়িতে অনুষ্ঠান, তাই জুতো বাইরে রেখে সবাইকে ভেতরে ঢুকতে হয়েছিল। এবার আমার জানা ছিল না, যে এত লোক নিমন্ত্রিত আর এরকম ব্যাপার।

তো আমি গেয়েছি সেখানে, মাত্র এক মাস মত আগে কিনা নতুন দামী জুতো পায়ে দিয়ে। জুতোটার কোয়ালিটি এতটাই ভাল ছিল আর এতটা সুন্দর আর কম্ফোর্টেবল ছিল, যে কারণে ওই এক মাসেই জুতোটা আমার বেশ প্রিয় হয়ে উঠেছিল। তো অত জুতোর মাঝখানে জুতোটা খুলে রাখার সময়, কেন জানিনা আমার মনে খটকা দিয়ে উঠলো। যে এখানে তো রাখছি, আবার গায়েব হয়ে যাবে নাতো? তাই হালকা একটু সাইড করে জুতাটা ওখানে খুলে রেখেই আমি ঘরে ঢুকে যাই।

এবার খাওয়া দাওয়া সেরে বাইরে বেরিয়ে এসে দেখি, ঠিক যে ভয়টা পেয়েছিলাম সেটাই হয়েছে। জুতো গায়েব! কোন একজন সহৃদয় ব্যক্তি, অলরেডি সেটা নিজের মনে করে পায়ে গলিয়ে নিয়ে হাঁটা দিয়েছেন। সাথে সাথে মনটা কেমন জানি খারাপ হয়ে গেল। একদিকে লজিক্যাল ব্রেন বলতে লাগলো, কি হয়েছে একটা জুতোই তো গেছে। কিন্তু ইমোশনাল ব্রেইন মানতে নারাজ। ইমোশনাল ব্রেইন নানান ধরনের একের পর এক নেগেটিভ যুক্তি আনতে শুরু করল, এতদিন পর একটা জুতো বেশ পছন্দ হয়েছিল, সেটাই হারাতে হলো। এত লোকের জুতো রয়েছে, তার মধ্য থেকে আমার জুতোটা যেতে হল। ইশ! কেন আমি অন্য জায়গায় একটু সাবধানে রাখলাম না।

এরকম একের পর এক ভাবনার স্রোত এসে, পুরো মনটাকে ভরিয়ে দিল। ফলাফল, আরো আস্তে আস্তে মনখারাপ বাড়তে লাগলো। কিন্তু তার ফাঁকে ফাঁকে লজিকাল ব্রেইনও একটু উঁকি মারতে থাকলো। একটা জুতোর জন্য মন খারাপ করে থাকবি। মন খারাপ করলে কি জুতোটা ফেরত পেয়ে যাবি।

তো এরকম বেশ কিছুক্ষণ লজিকাল আর ইমোশনাল ব্রেনের মধ্যে লড়াই চলার পর, হঠাৎই আমার মাথায় রিসেন্টলি পড়া, NORMAN VINCENT PEALE এর লেখা “THE POWER OF POSITIVE THINKING” বই থেকে শিখা একটা স্মার্ট আইডিয়া মাথায় স্ট্রাইক করল। এই বইতে লেখক বলেছিলেন, যে কিভাবে পজিটিভ কোনো থট বা অ্যাফারমেশন বারবার রিপিট করে, আমরা চাইলে আমাদের রিয়েলিটিটাকেও বদলে দিতে পারি। আমি দেখলাম, বেশ একটা ভালো সুযোগ পেয়েছি, তো টেস্ট করে দেখি সত্যি পজেটিভ থিংকিং এর পাওয়ার কতখানি?

তো আমি খেয়াল করে দেখলাম, আমার মাথায় যা চলছিল সেটা বেসিক্যালি হল, ইশ! জুতোটা হারিয়ে গেল, মনটা খারাপ লাগছে, তাই আমি ঠিক এর অপজিটটা জোর করে, মনে মনে রিপিট করতে শুরু করলাম। জুতোটা হারিয়ে গেল, তাই “আমি খুব খুশি।” বেশ কয়েকবার জোর করে রিপিট করার পর, ইমোশনাল ব্রেইন চেঁচিয়ে উঠলো। মানেটা কি? পাগল নাকি? জুতো হারিয়ে গেছে বলে খুশি! কোন আনন্দে খুশি হ্যাঁ? এই যে প্রশ্নটা, কোন আনন্দে খুশি? এটা ভাবনার সম্পূর্ণ একটা দিকই যেন খুলে দিল। যেটা এতক্ষণ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে পড়েছিল। এতক্ষণ ঘটনাটার যত বাজে দিক আছে, সেগুলোকেই আমি একের পর এক খুঁজে বের করছিলাম। কিন্তু যখন আমি জোর করেই, “আমি খুব খুশি”– এই তিনটি শব্দ বারবার মনে মনে বলতে লাগলাম, তখনই আমার চিন্তাভাবনার ফোকাসটা শিফট হয়ে গেল। ঘটনাটার ভালো কি কি দিক হতে পারে, সম্পূর্ণ সেইদিকে।

সবার প্রথমে তো হল, আবার নতুন আরেকটা জুতো পড়তে পারবো। তাছাড়া জুতোটা মাঝেসাজে পা দিয়ে খুলেও আসত। ভালোই হলো। এবার ওরকমই, কিন্তু বেল্ট দেওয়া একটা জুতো কিনবো। যাতে ওই সমস্যাটা আর ফেস করতে না হয়। আর জুতোটা যে নিয়েছে, তার নিশ্চয়ই জুতোটা খুব পছন্দ হয়েছে। কাউকে তো অন্তত তার পছন্দের একটা জিনিস গিফট করতে পারলাম।

এরকম একের পর এক পজিটিভ থট আসতে থাকাই, এতক্ষন অব্ধি, যে মন খারাপ লাগছিল, সেখানে মনে মনে সত্যিই যেন খুশি অনুভব হতে শুরু করলো। সত্যিই যেন রিয়েলিটিটাই আস্তে আস্তে বদলে গেল।

আপনার সাথেও যদি এরকম সিমিলার কিছু ঘটে থাকে, তাহলে আমার ধারনা, আপনি নিশ্চয়ই আমার কথা গুলির সাথে রিলেট করতে পারছেন। খুব ছোটখাটো জিনিস হয়তো হারিয়ে যায় বা নষ্ট হয়ে যায়, আর তার জন্য আমাদের মন খারাপ হয়ে যায়। এক কথায় বললে যখনই আমাদের সাথে এরকম কিছু ঘটে, যেটা আমরা চাইনা আমাদের সাথে ঘটুক। তখনই আমরা দুঃখী হয়ে পড়ি। কারণ, সে ঘটনার সাথে রিলেটেড সমস্ত নেগেটিভ ভাবনাগুলোই, একের পর এক আসতে থেকে, একটা লুক তৈরি হয়ে যায়। এই নেগেটিভ লুকটাকে ভেঙ্গে পজিটিভ লুক তৈরি করার জন্যে, আপনাকে সবথেকে বেস্ট সাহায্য করবে, এই তিনটে শব্দ- “আমি খুব খুশি।”

একদিন এক বাচ্চা ছেলের মা তাকে বলে, শোনো বাবা, জীবনে যাই করো না কেন, সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ হল, ‘খুশি থাকা।’ পরদিন ছেলেটি স্কুলে যায় এবং তার টিচার ক্লাসের সবাইকে একটা প্রশ্ন করেন, আচ্ছা বাচ্চারা, ‘তোমরা এক এক করে বলতো দেখি, তোমরা বড় হয়ে কি কি হতে চাও?’ অন্যান্য বাচ্চারা যেখানে কেউ বলল, ডাক্তার হতে চায়, কেউ বলল, পাইলট হতে চায়, সেখানে সেই বাচ্চা ছেলেটি বলল, “আমি বড় হয়ে খুশি হতে চাই।” তার উত্তরটা শুনে তার টিচার তাকে বলল, না না, তুমি আমার প্রশ্নটা ঠিক বুঝতে পারোনি। তারপর সেই বাচ্চা ছেলেটি উত্তরে সেই টিচারটিকে বলে, ‘না না ম্যাম, আপনিই জীবনটাকে বুঝতে পারেননি।’

আমরা জীবনে যেটাই করি না কেন, সেটা কোনো খারাপ কাজ হোক কি ভালো কাজ হোক, আলটিমেটলি করি, খুশি থাকতে পারার জন্য। কিন্তু আপনি যা চাইছেন, কখনোই সেটা সবসময় জীবনে পাবেন না।

তাই এই সমস্যার সাথে লড়াই করার জন্য একটা হাতিয়ার থাকা অত্যন্ত দরকার। আর সেই হাতিয়ার টাই হলো- “আমি খুব খুশি” এই তিনটি শব্দ। নেক্সটবার যখনই ছোটখাটো কারনে আপনার মন খারাপ হবে, যেটা আপনি লজিক্যালি জানেন, যে এইটুকুর জন্য এতটা মন খারাপ করা উচিত না। তখন একবারের জন্য জাস্ট এই হাতিয়ার টা ব্যবহার করে দেখুন- যে “আমি খুব খুশি”।

Similar Posts

2 Comments

  1. অনেক ভালো লাগলো লেখাটা পড়ে। আমরা যে লেখাগুলো সাধারণত পড়ি তার থেকে একটু আলাদা ধরনের লেখা। mind বা mind related ব্যাপারগুলো আমরা খুব কম analysis করি যার জন্য আমরা maximum time negativity তে বাস করি। যদি এমন চর্চা হত তবে জীবনটা অনেক অনেক জটিলতা পিছনে ঝেড়ে ফেলে দিতে পারত।
    আমি same ব্যাপারটা experience করেছি তবে ভিন্ন ভাবে।তখন আমার জানা ছিল না এই theory কিন্তু আমি তার সত্যতা দেখেছি ।

    1. আপনাকে সাহায্য করতে পেরে আমি সত্যিই কৃতজ্ঞ। আপনার বন্ধু-বান্ধবদের সাথে শেয়ার করুন।

      ইন শা আল্লাহ চেষ্টা করবো আমাদের লাইফ রিলেটেড পোস্ট গুলো দেওয়ার জন্য। আশা করি, সাথেই থাকবেন।

Comments are closed.