কেন বই পড়বো (পর্ব-১)

বই পড়াকে বিনোদন জগতে এক সময় অধিক প্রাধান্য দেওয়া হলেও বর্তমানে এর জনপ্রিয়তা অনেক বেশি কমে এসেছে। একসময় এই বই পড়েই মানুষ জীবনের সর্বোচ্চ আনন্দটুকু পেয়ে থাকতো। কল্পনা শক্তির মাধ্যমে নতুন এক জগতে হারিয়ে যাওয়া থেকে শুরু করে বিভিন্ন রকমের আশ্চর্যজনক তথ্য জেনে নিয়ে নিজের জ্ঞান বৃদ্ধি করা পর্যন্ত বিভিন্ন বিষয় শুধুমাত্র বই পড়ার মাধ্যমেই অর্জিত হয়ে থাকতো। আর আজ এই বই পড়াকে মানুষ সময়ের অপচয় বলে ধরে নেয়। স্মার্টফোন নামক অভিশপ্ত এক প্রযুক্তি এসে বইয়ের স্থান দখল করে নিয়েছে বিধায় বর্তমান প্রজন্মের ছোট ছোট ফুলগুলো বই পড়ার আসল মজা বুঝতে সক্ষম হচ্ছে না। বাবা মায়েরাও তাদের সন্তানকে বই পড়ার মূল্য বোঝাতে পারে না। ফলে এই প্রজন্মের বেশিরভাগ মানুষ মোবাইলে আসক্ত হয়ে ধ্বংসের পথে এগিয়ে যাচ্ছে।

why-read-books

স্মার্টফোন অবশ্যই খারাপ কিছু নয়। এই ফোনকে আবিষ্কার করাই হয়েছে মূলত জীবনের বিভিন্ন দরকারি কাজ গুলো খুব সহজে সমাধান করার জন্য। কিন্তু খারাপ জিনিসটা হচ্ছে আপনার তীব্র নেশা। স্মার্টফোনের নেশা কখনই ভাল হতে পারে না। এমনকি আপনি যদি মোবাইলে পিডিএফ এর বইও পড়ে থাকেন তবে মনে রাখবেন যে, এতে আপনি কিছুতেই আসল বই পড়ার মজাটা যেমন পাচ্ছেন না তেমনি আপনার নিজের চোখ দুটোকেও শীঘ্রই ধ্বংসের পথে নিয়ে যাচ্ছেন। তাছাড়া সোশ্যাল মিডিয়া ও অন্যান্য বিনোদন মাধ্যম হিসেবে মোবাইলকে ব্যবহার করার প্রচলন তো রয়েছেই। সব মিলিয়ে মানুষ মূলত আনন্দলাভের জন্য দিন দিন এই মোবাইলে আসক্ত হয়ে যাচ্ছে। ফলে বই চলে যাচ্ছে অনেক দূরে। আজকের এই আর্টিকেলটিতে তাই এই প্রজন্মের ও ভবিষ্যতের নবাগত সন্তানদের বই পড়া কেন উচিত সে সম্পর্কে কিছু আলোচনা করা হবে। মূলত নন বুক রিডারদের বইয়ের প্রতি আকৃষ্ট করার উদ্দেশ্যেই এই আর্টিকেলটি লিখা। তাহলে চলুন আমরা আর দেরি না করে জেনে নেই কেন আমরা বই পড়বো।


জ্ঞান বৃদ্ধি করা

ছোটবেলা থেকে আমরা শুনে এসেছি “জ্ঞানই শক্তি”। এই কথাটার কিন্তু অনেক বড় অর্থ রয়েছে। আপনার অর্থসম্পদ কিংবা জমিজমা অথবা গহনা এসকল সম্পদ কখনো না কখনো অন্যের দ্বারা আক্রমণ করে ছিনিয়ে নেওয়ার আশঙ্কা থাকলেও কেউ কখনো আপনার জ্ঞান আপনার থেকে ছিনিয়ে নিতে পারবে না। আর এই জ্ঞান নামক সম্পদ আপনার সবথেকে বড় শক্তি। যতদিন পর্যন্ত আপনি জ্ঞানকে আঁকড়ে ধরে রাখবেন ততদিন পর্যন্ত আপনি অনেক ভালো থাকবেন। আর এই জ্ঞান বৃদ্ধি করার অন্যতম উৎস বেশি বেশি বই পড়া। সুতরাং জ্ঞান নামক সম্পদকে অর্জন করতে হলে বেশি বেশি বই পড়ুন।


মস্তিষ্ক সুস্থ রাখা

আমরা জানি আমাদের শরীর সুস্থ রাখার জন্য যেরকম এক্সারসাইজ করার পাশাপাশি সুষম খাবার খাওয়ার প্রয়োজন পড়ে, ঠিক সেভাবেই আমাদের মস্তিষ্কের সুস্থতার জন্য আমাদের ব্রেইনকে ব্যবহার করার অনেক বেশি প্রয়োজন। আপনি আপনার ব্রেইনকে যত বেশি ব্যবহার করবেন তত বেশি এর নিউরন সেলগুলো বৃদ্ধি পাবে এবং আপনার মস্তিষ্ক অনেক সুস্থ থাকবে। মস্তিষ্ক সুস্থ রাখার মধ্যে যত রকমের কাজ রয়েছে তার মধ্যে বই পড়া অনেক সহজ এবং অন্যতম মাধ্যম। তাই মস্তিষ্কের সুস্থতা চাইলে প্রতিনিয়ত বই পড়ার অভ্যাস করতে পারেন।


মানসিক চাপ থেকে মুক্তি

প্রত্যেক ব্যক্তি জীবনের কোন না কোন সময় প্রচন্ড রকমের মানসিক চাপের মধ্যে জীবন অতিবাহিত করতে থাকেন। এই মানসিক চাপ নামক বিষয়টা এত বেশি যন্ত্রণাদায়ক যা শারীরিক যেকোনো ব্যথাকেও হার মানাতে পারে। এই মানসিক চাপ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য বিভিন্ন রকমের কাজ করা যেতে পারে। এক গবেষণায় বলা হয়েছে আপনি যদি ছয় মিনিট বই পড়তে পারেন তবে আপনার স্ট্রেস লেভেল ৬৮% পর্যন্ত কমে যাবে যা হাঁটা (৪২%), কফি পান (৫৪%), গান শোনা (৬১%) থেকে অনেক বেশি। সাধারণত যে সকল বইয়ে একেবারে ডুবে যাওয়ার মত সম্ভাবনা থাকে সেই সকল বই মানসিক চাপ কমাতে অনেক বেশী কার্যকর হয়।


সংলাপ দক্ষতা

আমরা জানি সমাজে বসবাস করতে হলে আশেপাশের মানুষদের সাথে একটা ভালো রকমের যোগাযোগ স্থাপন করার প্রয়োজন পড়ে। আর সেই যোগাযোগ মাধ্যমের অন্যতম প্রাণশক্তি হচ্ছে সংলাপ বা কনভারসেশন। আপনি আপনার সংলাপে যত বেশি দক্ষতা অর্জন করতে পারবেন তত তা আপনার আশেপাশের মানুষদের সাথে যোগাযোগ শক্তিশালী ও সুন্দর করতে সহায়তা করবে। আপনি যখন কোনো ভালো বই পড়বেন তখন দেখবেন এর ভেতরকার চরিত্ররা কিভাবে একে অপরের সাথে সুন্দর করে সংলাপ চালিয়ে যায়। তাই এই থেকেও আপনি আপনার সংলাপে বিভিন্ন দক্ষতা অর্জন করতে পারেন যা আপনার ভবিষ্যৎ জীবনে অনেক কাজে লেগে যাবে। মনে রাখবেন, চাকরি জীবন হোক বা নিজের ব্যক্তিগত জীবন সবক্ষেত্রেই একটা সুন্দর কনভারসেশন আপনাকে অন্যান্য ব্যক্তিদের কাছে একটা ভালো ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষে পরিণত করতে পারে। মনে করুন আপনার বসের সাথে আপনার কনভারসেশন চলাকালীন আপনি যদি অতি সুন্দর, শুদ্ধ ও স্পষ্ট ভাবে সংলাপ চালিয়ে যেতে পারেন তবে আপনার বস যারপরনাই মুগ্ধ হবেন। আর বসের এই মুগ্ধতা আপনাকে কোন পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে সেটা না হয় আপনি নিজেই ভেবে দেখুন। না-কি?


কল্পনা শক্তি বৃদ্ধি করা

বই পড়ার মাধ্যমে আপনার কল্পনা শক্তি উন্নত ও বৃদ্ধি হতে থাকে। আপনি যত বেশি বই পড়বেন তত আপনার মস্তিষ্কে নানা রকমের জল্পনা-কল্পনার সৃষ্টি হবে। এই কল্পনা আপনাকে নতুন এক দুনিয়ায় ঘুরিয়ে আনার পাশাপাশি আপনাকে বিভিন্ন রকমের সৃজনশীল কাজ করতে উৎসাহিত করবে। মনে রাখবেন সকল রকমের সৃজনশীল কাজ-ই কিন্তু কল্পনা শক্তির মাধ্যমেই সৃষ্টি হয়ে থাকে।


সহানুভূতি বোধ

সমাজে ভালোভাবে চলার জন্য ও সকল রকমের মানুষের সাথে মিলেমিশে থাকার জন্য সহানুভূতিশীল হওয়ার অনেক বেশি প্রয়োজন। এই সহানুভূতিশীলতাই কোনো ব্যক্তির সান্নিধ্য যাওয়ার অন্যতম মাধ্যম। যদি সমাজে মিলেমিশে বসবাস করে থাকা ব্যক্তিদের একে অপরের প্রতি সহানুভূতিশীল আচরণ প্রকাশ না পায় তবে তাদের মধ্যে বন্ধন কখনোই দৃঢ় হতে পারে না। আর এই সহানুভূতিশীলতার অনুশীলন হয়েই থাকে মূলত বই পড়ার মাধ্যমে। যখন কোন বইয়ের উপন্যাসের চরিত্র বিপদে পড়ে যায় কিংবা খুবই অসহায় অবস্থায় থাকে তখন আপনার মন নিজের অজান্তেই উক্ত চরিত্রের উপর সহানুভূতি অনুভব করতে থাকে। আর এই সহানুভূতিশীলতার চর্চাই আপনাকে বাস্তব জীবনে সহানুভূতিশীল মানুষ হিসেবে তৈরি করে ফেলার ক্ষমতা রাখে। তাই বলা যায় যে, বই পড়ার মাধ্যমে আপনি একজন সহানুভূতিশীল মানুষ হিসেবেও গড়ে উঠতে পারেন।

 

সুপ্রিয় পাঠক, এই আর্টিকেলটি প্রথম পর্ব এখানেই শেষ হচ্ছে। পরবর্তী আর্টিকেলটিতে আমরা বই পড়ার উপকারিতা সম্পর্কে আরও অনেক কিছু জানতে পারব। আজ এখানেই ইতি টানছি, ধন্যবাদ।

Similar Posts