মানব মূল্যায়ন কীসে? ব্যক্তিজীবনে নাকি কর্মজীবনে?

জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে নতুন করে বলার আসলে কিছুই নেই। নিজের অনবদ্য লেখনীর মাধ্যমে কীভাবে কাউকে মোহাচ্ছন্ন করে ফেলা সম্ভব হুমায়ূন আহমেদ তার পাঠক সম্প্রদায়কে সেটি খুব ভালো ভাবেই উপলব্ধি করাতে পেরেছিলেন। সে যাই হোক, আমার বর্তমান লেখনীটির মূল বক্তব্য আসলে ঠিক হুমায়ুন আহমেদের সাহিত্য জীবন কিংবা সাহিত্যিক হিসেবে হুমায়ুন আহমেদের সফলতা প্রসঙ্গে না, বরং আমার বক্তব্যের পুরো বিষয়টিই “মানব মূল্যায়ন”- কে কেন্দ্র করে হতে চলেছে। তবে কেনোই বা আমি আমার লেখনীর মূল বিষয়ে আসার পূর্বে হুমায়ুন আহমেদের প্রসঙ্গ তুললাম তা একটি ঘটনার উল্লেখপূর্বক পরিষ্কার হয়ে যাবে এই আশা রাখছি।

এইতো কিছুদিন আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমার একজন পরিচিত ব্যাক্তির সাথে মত আদান-প্রদানের এক পর্যায়ে আমি তাকে হুমায়ূন আহমেদের “জোছনা ও জননীর গল্প “ -এই বইটি কখনো পড়েছে কিনা এমনটি জানতে চাইলে আমার সেই বন্ধুটি উত্তর দিয়েছিলো যে হুমায়ূন আহমেদের লেখা তার ভালো লাগে না। যেহেতু আমি একজন বইপ্রেমি মানুষ এবং হুমায়ূন আহমেদের লেখা আমার বরাবরই ভালো লাগে, তাই কৌতূহলবশতই হুমায়ূন আহমেদের লেখা ভালো না লাগার কারণ জানতে চেয়েছিলাম। আর কারণ হিসেবে আমার সেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বন্ধুটির বক্তব্যটি ছিলো কিছুটা এমন যে, হুমায়ূন আহমেদ দুটি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন এবং যার দ্বিতীয় সহধর্মিনী ছিলেন কিনা উনারই মেয়ের বয়সি, আর তাই এমন একজন লেখকের লেখা কিভাবে কারো ভালো লাগতে পারে? আর হ্যাঁ ,আমার বন্ধুটির বক্তব্যটির ঠিক এই জায়গাটাতেই আমার আপত্তি। কেননা হুমায়ুন আহমেদ ব্যক্তিজীবনে কেমন ছিলেন সেটি কিন্ত আমি জানতে চাই নি, বরং আমাদের কথা হচ্ছিলো উনার বই প্রসঙ্গে অর্থাৎ উনার কর্মপ্রসঙ্গে। আর আমার কাছে মনে হয় যে মানুষের ব্যক্তিজীবন কখনোই তাঁর কর্মজীবনকে মূল্যায়ন করার অধিকার রাখে না।

আক্ষরিক অর্থে মানুষের একটি জীবন সম্পর্কে আমরা জানলেও আমার মতে মানুষকে তার এই এক জীবনে একই সাথে ব্যক্তিজীবন ও কর্মজীবন -এই দুটি জীবনের দায়িত্ব পালন করতে হয়। কোনো একজন মানুষের পক্ষে তার এই দুটি জীবনে একই সাথে সফলতা অর্জন করা যেমনি সম্ভব, তেমনি কেউ হয়তো তার কর্ম বা ব্যক্তিজীবনের কোনো একটিতে প্রগাঢ় সফলতা লাভ করলেও অন্যটিতে সেরূপ সফলতা লাভ করেন নি এমনটি শুনলেও অবাক হবো না। কারণ একজন মানুষকে জীবনের নানা ক্ষেত্রে নানা পরিস্থিতিতে ভিন্ন ভিন্ন আচরণ করতে হয়, আর জীবনের এই প্রত্যেকটি আচরণই যে তার সঠিক হবে না এটাই খুব স্বাভাবিক। কিন্তু আমরা যেটা করি সেটা হলো মানুষের কর্মজীবনকে তার ব্যক্তিজীবন এবং ব্যক্তিজীবনকে তার তার কর্মজীবনের সাথে গুলিয়ে ফেলি, যা কখনোই হওয়া উচিত নয়। কারন একজন মানুষের একার পক্ষে কখনোই সর্বেসর্বা হয়ে উঠা সম্ভব না।

আরেকটি উদাহরণ দেয়া যাক, ধরা যাক এম.বি.বি.এস পাশ করা একজন মেয়ে যে কিনা রান্না পারে না, বিয়ের পর তাকে তার শ্বশুরবাড়ির মানুষের কাছ থেকে এই নিয়ে অনেক কথা শুনতে হচ্ছে। মেয়ের পরিবারের মানুষ কেমন? মেয়েকে তো কিছুই শিখায়নি? এরকম হাজারো কথার ভিড়ে শুধুমাত্র রান্না না জানা এই একটি অতি তুচ্ছ কারনে এত্তদিন ধরে ডাক্তার হওয়ার জন্য মেয়েটির এবং তার পরিবারের সদস্যদের সকল কষ্ট এবং ত্যাগ মূহুর্তেই যেনো মূল্যবিহীন হয়ে যায়। যেই মেয়েটি ঘরের বাইরে আর দশজন মানুষের জীবন রক্ষা করে চলেছে, শুধুমাত্র রান্না কিংবা সাংসারিক কিছু কাজ না জানায় সে যেনো তার স্বামীর পরিবারের সকলের কাছে হয়ে উঠে মুল্যহীন, কিংবা তাদের ভাষ্যমতে “অকর্মা”। কিন্ত এরকম করাটা আসলে ঠিক কতটা যুক্তিযুক্ত কিংবা আদৌও এটা করা উচিত কিনা তা নিয়ে আমরা ঠিক কজনই বা ভাবি!

আসলে ভালো-মন্দ, প্রাপ্তি-হতাশা নিয়েই মানুষের জীবন, তাই কোনো একটি নির্দিষ্ট বিষয়কে কেন্দ্র করে মানুষের পুরো ব্যাক্তি কিংবা কর্মজীবনকেই মূল্যায়ন করে ফেলা উচিত নয়। কোনো মানুষের একটি দিক অথবা তার কোনো একটি কর্ম খারাপ হতে পারে, কিন্ত তাই বলে সেই একটি বিষয় বা কর্মকে কেন্দ্র করে তার অন্যান্য যেসব ভালো কিংবা প্রশংসনীয় দিক আছে সেগুলোকেও একই সুত্রে ফেলে অবমূল্যায়ন করা কোনোভাবেই সঠিক হতে পারে না।

তাই শেষ করার আগে বলবো, একটি প্রচলিত কথা আছে, “যে রাঁধে সে চুলও বাঁধে”, কিন্ত পাশাপাশি সেই কথার সুত্র ধরে আমাদের এটাও মনে রাখা উচিত যে, যে রাঁধে সে কখনো কখনো চুল বাঁধতে হয়তো নাও জানতে পারে, কিন্ত তাই বলে তার “রাঁধতে জানা”-টাকেও যেনো আবার আমরা অবমূল্যায়ন করে না ফেলি।
ধন্যবাদ।

Similar Posts

4 Comments

  1. ভালো লাগছে পুরো লিখাটা ।

    বিশেষ করে উদাহরণগুলো দিয়ে যুক্তি প্রদান এর যায়গাটাতে বেশি ভালো লাগছে ।

  2. লেখাটা ভালো ছিলো। হয়তো এটা শুরু আরোও অনেক দূর এগিয়ে যাবা আরও লেখা দিয়ে। কিন্তু একটা কথা না বললেই হয় না। কথাগুলো অনেক সহজ সরল ছিলো। আমার মতে লেখকের প্রতিটি লাইন এমন হবে যা দিয়ে ভাবসম্প্রসারন করা যাবে। তাই প্রতিটি লাইন ওভাবেই লেখার চেষ্টা করো ❤

    1. ধন্যবাদ, রাতুল ভাইয়া! আসলে একটু সহজ করেই লিখার চেষ্টা করেছিলাম। আর তোমার সাজেশন টাও ভালো লেগেছে?

Comments are closed.