ফুঁপির ডির্ভোস

কমলা রঙের সোফায় বসে আছি। দেখা বোঝা যাচ্ছে, সোফাটা বেশ দামি। এই সোফার সাথে আমার যায় না। বসাটাও বেমানান। সোফার পাশে একটা পালঙ্ক আছে।
আমি সে পালঙ্কে বসতে চেয়েছিলাম, কিন্তু কাজের মেয়ে আফরোজার মুখে যখন দাম শুনি তখন পালঙ্কে বসার ইচ্ছা উবে গেছে। আমার আইডিয়া দেখি বেশ ভাল। আইডিয়া করা দামের সাথে সোফার প্রকৃত দাম মিলে গেছে।
সোফার দাম- দুই লক্ষ পঞ্চান্ন হাজার টাকা।
সোফার ফোমটা বেশ আরামের। আমি কি বসে আছি নাকি শূন্যতে ভাসছি তা টের পেতে রীতিমত মুশকিলে পরে যাচ্ছি। সদ্য কেনা সোফা লাইটের আলোয় চকচক করছে।
আফরোজা বলল, ফুপির ভাষ্যমতে- এই সোফার উপরে নাকি আর কোন সোফা নেই।” উচ্চবিত্তদের এই একটাই দোষ, তারা উচ্চ দামে যা কিছুই কিনে তার উপরে আর কোন কিছুই থাকে না।
তাঁদের সুখ উচ্চ দামে, উচ্চ বিলাসিতায়।
.


আমার রুমের বেতের সোফাটা বছর তিনেক আগে কিনা। কিনার সময় ডিসকাউন্ট দিয়ে দাম নিয়েছিল আড়াই হাজার টাকা। বর্তমানে দুই তিনটা বেত নষ্ট হয়েছে, তবুও এখনও বেশ বসা যায়।
মাঝে মাঝে বিছানারও কাজ দেই। আমি এখন ভাবছি, “দুই লক্ষ পঞ্চান্ন” হাজার টাকা দিয়ে কতশত সোফা কিনতে পারা যাবে তা। আমার মনে হয় এই টাকা দিয়ে আস্ত এক বেতের সোফার দোকান দেওয়া যাবে।
দোকানের নাম ফুপার নামে দেওয়া উচিৎ। এতে তিনি আমাকে তার অফিসে ডেকে নিয়ে ভাল-মন্দ উপদেশ দিবেন, সাথে ভাল-মন্দ খাওয়াবেনও। তার অফিসের কফিটা এক কথায় দারুন। ঢাকার অভিজাত রেস্তোরায়ও এইরকম কফি পাওয়া যায় না।
অফিসে যিনি কফি বানান তিনিও কফির মত দেখতে দারুণ সুন্দরী। বোধয়, তার রূপে কফির স্বাদ বেড়ে যায়। একবার একটা কাজে ফুপার অফিসে গিয়েছিলাম। ফুপা আমাকে বসতে বলে ল্যান্ড ফোনে দুইটা কফির অর্ডার করেছিলেন। একটু পর একজন লম্বাচুড়া মানুষ কফির ট্রে নিয়ে ফুপার রুমে ঢুকলেন। ট্রে টেবিলে রাখার সময় ফুপার উদ্দেশ্যে করে বললেন, “স্যার এস্পেশিয়াল কফি।” তার কথা বলার ধরণ দেখে আমি অবাক হয়ে গেলাম। এত স্মার্ট ছেলে কেন এখানে এত ছোট পদে কাজ করছে তা ভাবতে আমার বেশ বেগ পেতে হয়েছিল।
ট্রে থেকে ফুপা কফির মগ হাতে নিয়ে আমার উদ্দেশ্যে বললেন, “মুগ্ধ, কফি নাও। এই কফি শুধু আমার বিদেশি ক্লায়েন্টদের জন্যে বানানো হয়। বিশেষ করে আমেরিকা,ইউরোপ থেকে যেসব ক্লায়েন্টরা আসে তাদের জন্যে।”
কফি দেখে তাই-ই মনে হল। কফির উপর লাভ সাইনের বিশেষ কারুকার্য করা। এই কারুকার্য দেখে মনের ভেতর হিম বয়ে গেল। কফি মেকার রূপসী তো জানেই এই মুহূর্তে আমেরিকা,ইউরোপ থেকে কোন ক্লায়েন্ট আসেনি। তাহলে কেন সে এস্পেশিয়াল কফি বানিয়ে এখানে পাঠাল? ফুপা তো শুধু কফির কথা বলেছিল। এস্পেশিয়াল কিছুই বলেনি। রূপবতীদের সাধারণ কোন ইঙ্গিত পুরুষরা অসাধারনভাবে নিজের ভেতর নিজের মত করে একটা স্বপ্ন, একটা ব্যাখা দাঁড় করিয়ে ফেলে।

– মুগ-ধ কখন এসেছিস?
ফুঁপির কিন্নরী কণ্ঠ কানে আসার সাথে সাথে অন্য জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ফুঁপির দিকে তাকালাম। ফুঁপি আমার নামটা কখনও স্পষ্ট করে ডাকতে পারেনি। ফুঁপি মুগ্ধ নামটা বেশ মমতা দিয়ে ডাকতে গিয়ে নামের পোস্টমডাম করে ফেলে। তবে এই নিয়ে আমার কোন আক্ষেপ নেয়। প্রিয় মানুষরা প্রিয়জনকে হরেক ভাবে ডাকতে ভালবাসে। সে ভালবাসার ভুল ধরা অপরাধ।

– একটু আগে এসেছি।
– কেন ডেকেছি তা বোধয় বুঝতে পেরেছিস।
– হা, তাই তো এসে সোফায় বসে গেলাম।
– সোফাটা তোর ভাল লেগেছে?
– চমৎকার লেগেছে, নিশ্চয় তোমার পছন্দ?
– হা। কেমন করে বুঝেছিস?
– তোমার পছন্দ সবসময় আলাদা, লোকজনের সাথে মিলে না।
– খোঁচা দিয়েছিস?
– একদম না, তারিফ করেছি। এই তারিফকে তুমি খোঁচা হিসেবে নিলে সেখানটাই আমি নীরব।
– আচ্ছা, তোকে আর একটা কাজে ডেকেছি।
– কি কাজ?
– একটা খাম আলতাফ মাহমুদের কাছে পৌঁছে দিতে হবে।
– দিয়ে দাও, পৌঁছে দিব। কিন্তু তুমি ফুপার নাম ধরলে কেন? স্বামীর নাম মুখে আনা পাপ, গ্রামের বুড়িরা বলে। গ্রামের বুড়িদের আমার বেশ ভাললাগে এইসব সুন্দর সুন্দর আজগুবি কথা গুলার জন্যে।
– সে কথা তোকে যেতে যেতে বলব। এর আগে একটা সিএনজি ডেকে আন।

আমি কথা না বাড়িয়ে সিএনজি ডাকতে বের হলাম। রাস্তায় যখন নামলাম তখন মনে হল নিচে তো ফুঁপির গাড়িটা ছিল। ড্রাইভার গাড়ির ভেতর বসে অসভ্য গান শুনছে। এই ড্রাইভারটা বেয়াদব প্রকৃতির ড্রাইভার।
সুযোগ পেলে সে অসভ্য গান শুনে। ফুঁপি কেন সিএনজি ডাকতে বলল তা আমার মাথায় আসল না। ফুঁপির কি আজ সিএনজি করে ঘোরার ইচ্ছা হল নাকি? উচ্চবিত্তদের ইচ্ছার কোন অভাব নেই।
ইদানীং ঢাকা শহরের সিএনজি ড্রাইভারগুলা বেশ ভদ্র হয়ে গেছে। আজকাল তারা মিটারে যাওয়া আসা করে। তবে ত্যাঁদড় ড্রাইভারের সংখ্যা এখনও অনেক। তারা মিটারে যা আসে তার থেকে আরও বেশ কিছু দাবি করে বসে থাকে।
সাথে বউ,বাচ্চার নিদারুণ কষ্টের কথা তোলে ধরে। কেউ কেউ এই কষ্টে গলে গিয়ে নিজের পকেট বিলিয়ে দেই। আমি পকেট বিলিয়ে দেওয়ার মানুষ না। মিটারে একটা সিএনজি ঠিক করে ফুঁপির বাসার নিচে দাঁড়ালাম।
ফুঁপি দেখি সিঁড়ি দিয়ে নামছে, হাতে একটা ছোটখাটো ব্যাগ। ভাব-গতি বোঝা যাচ্ছে না। আমাকে দেখে সিএনজিতে উঠে বসল। বেয়াদব ড্রাইভারটা ফুপিকে দেখে তাড়াতাড়ি গান বন্ধ করে সিএনজির সামনে এসে দাঁড়াল।
তারপর বিনয়ের সুরে বলল,”আপা, আপা কই যাচ্ছেন?”
ফুঁপি অগ্নিমূর্তি ধারণ করে বলল, “জাহান্নামে যাচ্ছি।”
ফুঁপির আকস্মিক এমন উত্তরে আমি শিউরে উঠলাম। একটু আগেও ফুঁপি স্বাভাবিক ভাবে আমার সাথে কথা বলল আর এখন অগ্নিমূর্তি ধারণ করে আছে। মেয়েদের মন আকাশের মত পরিবর্তন হয় সে কথা আমার জানা আছে। আমি বেয়াদব ড্রাইভারের দিকে তাকিয়ে কিছুই হয়নি এমন ভান করে হেসে জিজ্ঞাস করলাম,” কেমন আছেন? দিনকাল কেমন যাচ্ছে?”
উত্তর পাওয়ার আগে সিএনজি ছুটল ফুঁপির নির্দেশ মতে।
.
চারদিক পিছনে ফেলে চুপচাপ ছুটছে সিএনজি, মিটারও ছুটছে। সিএনজির ভিতরের পরিবেশ থমথমে। ফুঁপি অগ্নিমূর্তি কেন ধারণ করছে তা এখনও বুঝে উঠতে পারছি না। থমথমে পরিবেশ হালকা করতে আমার কথা বলা প্রয়োজন।
চুপচাপ থাকলে পরিবেশ আরও থমথমে হয়ে যাবে।
– ফুঁপি ওর সাথে এইভাবে রেগে গেলে কেন?
– কেন রেগেছি তা কি তোকে জানানো দরকার?
– তুমি দরকার মনে করলে দরকার, নয়ত অপশনাল।
– এর আগে বল আলতাফ মাহমুদের অফিসের কফি মেকার কে চিনিস?
– হ্যাঁ চিনি, এই ঢাকা শহরে ফুপার অফিসের কফির মত আর কফি কোথাও হয় না। আমি অনেক জায়গায় কফি খেয়েছি। কিন্তু এইটার মত স্বাদ আর কারুকার্য কোন কফি শপে দেখি নাই।
– মেয়েটা কেমন?
– বেশ সুন্দরী। রীতিমত তার রূপে মুগ্ধ হয়ে বোবা হয়ে যাওয়ার মত ভয়ঙ্কর সুন্দরী।
– তোর ফুপা সে সুন্দরীর রূপে বোবা হয়ে এখন তার সাথে রাত কাটাই। সুন্দরী বেশ যত্ন করে তার আদর করে।
– ফুঁপি তুমি ফুপার নামে এইভাবে বাজে কথা বলতে পার না। আমার কাছে তো নাই-ই।
– আমি সব জেনে শিউর হয়ে তোকে এইসব বলছি। কফি মেকার মেয়েটার সাথে যে হ্যান্ডসাম ছেলেটা থাকে সে আমাকে এইসব বলেছে। মেয়েটা একজনকে ভালবাসে কিন্তু কাকে ভালবাসে সে কথা তোকে বলা যাবে না।
এইখানে দুইটা খাম। একটা তোর আরেক টা আলতাফ মাহমুদের। দুই খামেই সব প্রমাণ আছে। ইচ্ছে হলে তোর খামটা তুই খুলে দেখতে পারিস। আর অপর খামে প্রমাণের সাথে ডিভোর্স লেটার আছে। আমি সই করে দিয়েছি।
– ডিভোর্স লেটার দেওয়ার আগে ফুপার সাথে একবার কথা বলার দরকার ছিল।
– দরকার নেয়। এই ব্যাপারে তাকে আমি অনেকবার শুধরাতে বলেছি। সে বলেছে এইসব কিছুই সে করছে না। হাতে প্রমাণ আসার পর আবার বলেছি। কিন্তু সে আমার কথা শুনে নাই। ধন-বাড়ি-গাড়ি দিয়ে কি হবে যদি মন ভাল না থাকে?
– তাহলে সোফা কেন কিনলে?
– তারা নাকি সোফাতে বেশ এঞ্জয় করে, আমি সরে গিয়ে এঞ্জয় করার পথ সুগম করে দিয়েছি।

ফুঁপি কাঁদছে। সিএনজি ছুটছে, মিটার ছুটছে। শুধু আমার পৃথিবী থমকে আছে। থমথমে পরিবেশে পৃথিবী থমকে যাবে কে জানত এইকথা?

Similar Posts