tawsiful_islam / এপ্রিল 1, 2021

১ দিনে খাগড়াছড়ি ভ্রমণ

শেয়ার করুন আপনার বন্ধুদের সাথে
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বিভাগে অবস্থিত পার্বত্য অঞ্চল খাগড়াছড়ি ভ্রমণপিয়াসুদের জন্য অন্যতম প্রিয় একটা জায়গা। এখানে রয়েছে বেশ কয়েকটা দর্শনীয় স্থান তথা ট্যুরিস্ট স্পট। এ লেখা পড়ে আপনারা জানতে পারবেন এক দিনের মধ্যেই খুব অল্প খরচে কীভাবে এ পাহাড়ি অঞ্চলটি ঘুরে ফেলা যেতে পারে!

খাগড়াছড়িতে যেসব দর্শনীয় স্থান বেড়াতে পারেনঃ

১. আলুটিলা গুহা

২. রিসাং ঝরনা

৩. তারেং

৪. জেলা পরিষদ হর্টিকালচার পার্ক (ঝুলন্ত ব্রীজ)

৫. হাতিমুরা/হাতিমাথা পাহাড়

ঢাকা থেকে যেভাবে খাগড়াছড়ি যাবেনঃ

ঢাকা থেকে বেশ কয়েকটা বাস পরিবহন খাগড়াছড়ি নিয়ে চলে। নন এসি ৫২০ টাকা আর এসি বাসভেদে পড়বে ৯০০-১২০০ টাকা। সময় লাগবে ৭-৮ ঘণ্টা। ঢাকা থেকে রাতের বাসে উঠলে সকালেই পৌঁছে যাবেন খাগড়াছড়ি সদরে।

এরপর?

এরপরেই যে কাজটা করবেন সেটা হল সকালের নাস্তা সেরে নিবেন। খাগড়াছড়ি সদরেই কিংবা অটোরিকশা করে আরো একটু সামনে গেলে হোটেল পেয়ে যাবেন বেশ কয়েকটা। নাস্তার পর আপনাদের প্রথম স্পট হতে পারে হাতিমুরা পাহাড়। স্থানীয়ভাবে এটা ‘হাতিমাথা’ কিংবা ‘মায়ুং কপাল’ হিসেবেও পরিচিত।

<img src="image.png" alt="স্বর্গের সিঁড়ি, হাতিমুরা পাহাড়।">
স্বর্গের সিঁড়ি, হাতিমুরা পাহাড়। ছবিঃ লেখক

কীভাবে যাব হাতিমুরা?

খাগড়াছড়ি সদর থেকেই অটোরিকশা করে যেতে হবে। পানছড়ি যাওয়ার পথে জামতলীস্থ যাত্রী ছাউনি এর সামনে নেমে যেতে হবে, এক্ষেত্রে ভাড়া হবে জনপ্রতি ১৫ টাকা। হাতিমুরা জায়গাটা এখনো ট্যুরিস্ট স্পট হিসেবে অতটা সুখ্যাতি পায়নি বলে অনেকেই হয়তো চিনতে পারবে না। সেক্ষেত্রে হাতিমাথা কিংবা মায়ুং কপাল বলে জিজ্ঞাসা করে নিতে পারেন।

যাত্রী ছাউনিটার বাম দিকের রাস্তা ধরে এগিয়ে গেলে সামনে চেঙ্গি নদী পাবেন। বর্ষার সময় গেলে হয়তো নৌকা দিয়ে পার হতে হবে, শীতের সময় গেলে একটা সাঁকো ধরেই সহজে পার হয়ে যেতে পারবেন।

পার হয়ে একটু উপরের দিকে উঠলেই পাবেন পল্টনজয়পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। স্কুলটার সামনের হাতের ডানদিকে একটা দোকান পাবেন, সে দোকানের পাশ দিয়ে যে রাস্তা গিয়েছে সেদিক দিয়ে এগিয়ে যেতে হবে।

আপনারা যদি প্রথমবার গিয়ে থাকেন, তবে একটা গাইড নিয়ে নিবেন। চিনতে, কিংবা সুরক্ষার জন্যেও গাইড নেয়া ভালো হবে। খরচ পড়বে ৩০০-৫০০টাকা। গাইড না নিলে মানুষজনকে জিজ্ঞেস করে করে এগিয়ে যেতে থাকবেন।

পাহাড়ি পথ পায়ে হেঁটে হেঁটে প্রায় দেড়-দু ঘণ্টা পর আপনি পৌঁছাবেন ‘স্বর্গের সিঁড়ি’ এর সামনে। পাহাড়িদের চলাচলের সুবিধার্থে এখানে প্রায় ৩০০ ফিট উঁচু বিশাল একটা সিঁড়ি নির্মাণ করা হয়েছে। ধাপসংখ্যা আড়াইশো-তিনশো এর মত। নিচ থেকে উপরে তাকালে আপনি এর শেষ দেখতে পাবেন না। মনে হবে পাহাড়ে উপরে কোথাও আকাশে মিশে গিয়েছে!

সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠার পর আরো সামনে গেলে আপনি পাহাড়ীদের গ্রাম আবিষ্কার করে ফেলবেন। আর চোখে পড়বে অনিন্দ্যসুন্দর পাহাড়ী দৃশ্য। উপরে একটু সময় কাটিয়ে এরপর আস্তে আস্তে নেমে আসতে পারেন।

এখানে বেশ কিছু উঁচু-নিচু পাহাড়ি পথ পাড়ি দিতে হয় বলে ট্রেকিংটা কষ্টসাধ্য। সাথে অবশ্যই পানি আর শুকনো খাবার রাখবেন।

হাতিমুরা পাহাড়টা শেষ করতে চার-পাঁচ ঘণ্টার বেশি ব্যয় করবেন না। সেখান থেকে বেরিয়ে এলেই দুপুর হয়ে যাবে, তখন চলে যাবেন লাঞ্চ করতে।

যাবো কোথা, খাবো কোথা?

লাঞ্চ করতে ফিরে আসতে পারেন আবার খাগড়াছড়ি সদরে। কিংবা সেখান থেকে সামনে গেলে বেশ কয়েকটা দৃষ্টিনন্দন হোটেল/রেস্টুরেন্ট খুঁজে পাবেন। দিনের বাকি সময়ের জন্য এখন সিএনজি রিজার্ভ করে নিতে পারেন। খাগড়াছড়ির বাকি দর্শনীয় স্থানগুলো তারা আপনাকে ঘুরিয়ে আনবে। এক্ষেত্রে সিএনজি রিজার্ভ ভাড়া হতে পারে ১০০০ টাকার মত বা কিছু কম-বেশি। সিএনজিতে অনায়াসে পাঁচজন বসে যেতে পারবেন। দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত আপনি যেখানে যেতে চাইবেন সেখানেই নিয়ে যাবে। এক ফাঁকে ঢাকায় যাওয়ার রাতের ফিরতি বাসের টিকিটও কেটে ফেলতে পারেন।

হর্টিকালচার হেরিটেজ পার্কঃ

সদর থেকে অল্প দূরত্বেই পার্কটি রয়েছে। এর প্রবেশমূল্য ৩০ টাকা। ভেতরে সবচেয়ে মূল আকর্ষণ হল একটা ঝুলন্ত ব্রীজ। ব্রীজটা এমনভাবে স্থাপন করা যেন আপনি যতই সামনে যাবেন ততই সেটা দুলতে থাকবে। ঠিক মাঝ বরাবর দুলুনিটা বেশি অনুভব করতে পারবেন।

ব্রিজ ছাড়াও এখানে রয়েছে লেক, ফোয়ারা, টয় ট্রেন, ওয়াচ টাওয়ার, কিছু রেস্টুরেন্ট, শাড়ির দোকান ইত্যাদি। লেকে জনপ্রতি ৩০ টাকায় নৌকায় করে ঘুরারও ব্যবস্থা আছে।

<img src="image.png" alt="ঝুলন্ত ব্রীজ">
হর্টিকালচার হেরিটেজ পার্ক ঝুলন্ত ব্রীজের সম্মুখভাগ। ছবিঃ লেখক

আলুটিলা গুহাঃ

এখন চাইলে আপনি রিসেং ঝরনা কিংবা আলুটিলা গুহার যে কোনোটায় যেতে পারেন। গুহাটা বিকেলে বন্ধ করে দেয়া হয়, তাই সেখানেই আগে যাওয়া ভালো হবে। সমুদ্রসমতল থেকে প্রায় ৩০০০ ফিট উপরে অবস্থিত আরবারী পাহাড়ে এ সুড়ঙ্গ বা গুহাটির অবস্থান। প্রবেশমূল্য ৪০ টাকা। মূল গেট থেকে ভেতরে ঢুকে কিছুটা নিচের দিকে নেমে যেতে হয়, এরপর দুটো পথ পাওয়া যায়। একটা পথ ধরে গিয়ে গুহাঅভিমুখী হয়ে গুহার অপর প্রান্ত হয়ে অপর পথ দিয়ে ফিরে আসতে হয়। গুহার উপরের জায়গাটা থেকে খুব সুন্দর একটা ভিউ পাওয়া যায় পুরো খাগড়াছড়ির।

সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে গেলে গুহার মুখটি পাওয়া যাবে। অন্ধকার একটা গুহা। ভেতরে নিকষ কালো জমাট বাঁধা অন্ধকার, সূর্যের আলোও প্রবেশ করেনা। ভেতরটা শীতল পাথুরে আর পিচ্ছিল, পায়ের নিচ দিয়ে চলে যায় শীতল জলের ধারা। মোবাইলের ফ্ল্যাশলাইট ব্যবহার করে পথ ধরে ধরে এগিয়ে যেতে থাকবেন।

কিছুদূর যাওয়ার পর দুটো পথ পাবেন, তখন বাম দিকের পথ ধরে যেতে হবে। কিছু জায়গায় ছাদ অনেক নিচু হওয়ায় মাথা নিচু করে সামনে এগিয়ে যেতে হয়। পুরো গুহাটা পার করতে সময় লাগবে পনেরো থেকে বিশ মিনিটের মত। কিন্তু এইটুকু সময়ের মধ্যেই অসাধারণ একটা রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা পাবেন।

<img src="image.png" alt="আলুটিলা গুহার প্রবেশ মুখ">
আলুটিলা গুহার প্রবেশ মুখ। ছবিঃ লেখক

রিসাং ঝরনাঃ

রিসাং ঝরনার জন্য প্রবেশমূল্য ২০ টাকা। সিএনজি করে এলে মূল ফটক থেকে বেশ কিছুদূর সামনে যেতে পারবেন। তবে জিপে করে এলে এই পথটা যেতে হবে পায়ে হেঁটে। সিএনজি রেখে ইট-বাঁধানো পথ ধরে আরো বিশ-ত্রিশ মিনিট পথ গেলে তবে পাবেন এ ঝরনার সন্ধান! তবে এজন্য পেরোতে হবে বেশ কয়েকটা সিঁড়ি, আর এ সময়ে আশেপাশে উপভোগ করবেন চমৎকার সবুজ পাহাড়ি সৌন্দর্য।

১০০ ফুট উঁচু পাহাড় থেকে নিচে গড়িয়ে পড়ে ঝরনার পানির ধারা। বর্ষার সময়ে অনেক বেশি পানি দেখতে পাবেন, অন্যসময় গেলে হয়তো পানি অতটা দেখতে পাবেন না। পানির গতিপথ ঢালু হওয়ায় প্রাকৃতিক ওয়াটার স্লাইডিং-এর সৃষ্টি হয়েছে, যা এই ঝরনার প্রধান আর্কষণ। তবে ওই ঢালু পথটা তুলনামূলক বিপজ্জনক, পায়ে ভালো গ্রিপ না থাকলে উপরে না যাওয়াই ভালো। নিচে যে পানি এসে জমা হয়, তা একেবারে হিমশীতল। সারাদিন পর রিফ্রেশ হওয়ার অনুভূতি পাবেন এখানে।

<img src="image.png" alt="রিসাং ঝরনা ">
চোখ জুড়ানো জলধারার রিসাং ঝরনা। ছবিঃ লেখক

তারেংঃ

তারেং কে বলা যায় খাগড়াছড়ির সর্বোচ্চ স্থান। এখান থেকে পুরো খাগড়াছড়ি অঞ্চলের চমৎকার একটা ভিউ দেখতে পাওয়া যায়। বলা হয়, ‘পাখির চোখে খাগড়াছড়ি দেখা’। উপর থেকে দেখতে পাবেন সর্পিলভাবে বয়ে চলা চেঙ্গি নদী। পর্যটনকেন্দ্রটার আশেপাশে চোখে পড়বে অসংখ্য জুমক্ষেত। সবুজের ছড়াছড়ি দেখতে পাবেন, চোখে পড়বে আনারস, কমলা ও সবজির বাগান।

সারা দিন শেষে চোখ-জুড়ানো এ দৃশ্য দেখে ক্লান্তি কাটিয়ে ফেলতে পারবেন অনেকটাই।

আরো কিছু বাকি আছে কি?

কিছু জায়গা বাদ থাকবে অবশ্যই। কিন্তু ততক্ষণে সন্ধ্যে নেমে আসবে, আর আপনার শরীরেও শক্তি অবশিষ্ট থাকবে না। এরপর ফিরে চলে আসবেন খাগড়াছড়ি সদরে। ডিনার করবেন, আর করবেন বাসের জন্যে অপেক্ষা। ইচ্ছে করলে আশেপাশের বাজার থেকে কিছু কেনাকাটাও করে নিতে পারেন।

বিশেষ কথাঃ

আপনি যদি এ নির্দেশিকা হিসেবে ভ্রমণ করে থাকেন তবে চার/পাঁচজনের একটা দলের জন্যে মোট খরচ হবে দু’হাজার বা তারও কম টাকা। তবে একদিনের ট্যুর হওয়ায় শরীরের উপর ধকল যাবে খুব। আপনি চাইলে ‘হাতিমুরা পাহাড়’ টা বাদ দিতে পারেন, এতে ধকল অনেক বেশিই কমে যাবে। সকালটা শুরু করতে পারেন আলুটিলা গুহা দিয়ে। এছাড়া তৈলাফাং ঝরনা, দেবতার পুকুর, তৈদুছড়া ঝরনা, নিউজিল্যান্ড পাড়া ইত্যাদি যোগ করতে পারেন আপনার লিস্টে। এক্ষেত্রে সকালেই সিএনজি রিজার্ভ করে নিতে পারেন, খরচটাও একটু বেশি হতে পারে।

সতর্কতার কিছু কথাঃ

১. হাতিমুরা পাহাড়ে গেলে পানি আর শুকনো খাবার রাখবেন। ব্যাগ নিয়ে উঠতে কষ্ট হলে নিচের দোকানের ঘরে ব্যাগ রেখে যেতে পারেন। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ জিনিস সবসময়েই নিজের হেফাজতে রাখবেন।

২. স্থানীয়দের বিরক্ত করবেন না।

৩. কোথাও ময়লা ফেলবেন না। পরিবেশ দূষণমুক্ত রাখা আমাদের সকলের দায়িত্ব।

৪. রিসাং ঝরনার ঢালে যদি উঠেন তবে অনেক সাবধানতা অবলম্বন করবেন।

পরিশেষে বলতে চাই, আপনার ভ্রমণ রোমাঞ্চকর ও সুখকর হোক। শুভকামনা আপনার জন্যে।

তথ্যসূত্রঃ

১. http://www.khagrachhari.gov.bd/site/view/tourist_spot/

(Visited 74 times, 14 visits today)


শেয়ার করুন আপনার বন্ধুদের সাথে
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

FILED UNDER :ভ্রমণ